অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল আজিজ 

অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল আজিজ 

চেয়ারম্যান, হেমাটোলজি বিভাগ, বিএসএমএমইউ


০৮ মে, ২০২৩ ০৯:১৯ এএম

থ্যালাসেমিয়া চিহ্নিত করার উপায় ও চিকিৎসা 

থ্যালাসেমিয়া চিহ্নিত করার উপায় ও চিকিৎসা 
অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল আজিজ

থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রক্তস্বল্পতাজনিত রোগ। এই রোগে রক্তে অক্সিজেন পরিবহনকারী হিমোগ্লোবিন কণার উৎপাদনে ত্রুটি হয়। থ্যালাসেমিয়া বহনকারী মানুষ সাধারণত রক্তে অক্সিজেনস্বল্পতায় (অ্যানিমিয়া) ভুগে থাকেন। এটি কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়, আবার রক্তের ক্যান্সারও নয়। জিনগত ত্রুটির কারণে এই রোগে অস্বাভাবিক হিমোগ্লোবিন তৈরি হয় বলে লোহিত রক্তকণিকা সময়ের আগেই ভেঙে যায়। ফলে রক্তশূন্যতা দেখা দেয়। 

থ্যালাসেমিয়া কী?  

থ্যালাসেমিয়া রোগটায় দুইটা অংশ, একটা রক্তস্বল্পতা আর অন্যটা জন্মগত। জন্মগত অর্থে বাবা-মা যে কোনো একজনের অথবা দুই জনেরই থ্যালাসেমিয়া থাকতে পারে। সেখান থেকে সন্তান থ্যালাসেমিয়ার রোগী হওয়ার আশঙ্কা থাকে। মানুষের শরীরে ২৩ জোড়া ক্রোমোজম থাকে। মানুষের ২৩ জোড়া জিন, যাকে বাংলায় বলে ক্রোমোজম। এই ক্রোমোজমে ত্রুটি থাকে। কখনও একজন মানুষের জন্য ২টা ক্রোমোজম থাকে। ক্রোমোজম থাকে সব সময় জো্ড়ায় জোড়ায়। কারও যখন একটা ক্রোমোজম ত্রুটিযুক্ত হয়, তাকে ক্যারিয়ারস্টেট বলে। আর যখন ২টা ক্রোমোজমে ত্রুটি থাকে তাকে ডিজিজস্টেট বলে। রক্ত স্বল্পতা আর জন্মগত ত্রুটিই হলো থ্যালাসেমিয়া। 

থ্যালাসেমিয়া কি ছোঁয়াচে রোগ? 

থ্যালাসেমিয়া জন্মগত রোগ। এর সাথে ছোয়াছে রোগের কোনো সম্পর্ক নেই। আল্লাহর অশেষ মেহেরবাণী যে, থ্যালাসেমিয়া জন্মগত রোগ হলেও এটা ছোঁয়াছে না। ছোঁয়াচে রোগের ভয়বহতা অনেক। করোনার মতো একটি ছোঁয়াছে কোটি কোটি মানুষ মারা গেছে। 

থ্যালাসেমিয়ার লক্ষণ

থ্যালাসেমিয়া একটি রক্ত স্বল্পতার রোগ। আর মানুষের রক্ত স্বল্পতা থাকলে দুর্বলভাবে কথা-বার্তা বলবে, বুক ধরফর করবে, ফ্যাকাসে হয়ে যাবে। এগুলো সবই থ্যালাসেমিয়ার লক্ষণ হিসেবে থাকে। 

এ ছাড়া অ্যানিমিয়া থাকবে, জন্ডিস ও রক্ত ভেঙে দেয় থ্যালাসেমিয়া। মূলত মানুষের লোহিত রক্তকণিকার গড় আয়ু ১২০ দিন। কিন্তু থ্যালাসেমিয়া রোগীর লোহিত রক্তকণিকার গড় আয়ু মাত্র ৫০ দিন আবার কারো ৬০ দিনও বাঁচে। অর্থাৎ অপরিপক্ব অবস্থায় রক্তকণিকা ভেঙে যায়, তাই রক্তস্বল্পতা দেখা দেয়। এই লক্ষণগুলো থাকলে ধারণা করা হয়, মানুষটি থ্যালাসেমিয়া ভুগছেন। এর বাইরেও কিছু লক্ষণ আছে। 

থ্যালাসেমিয়ার সবচেয়ে তীব্র ও জটিল ধরন ‘মেজর’ ,  ‘ইন্টারমিডিয়েট’ বা মধ্যম পর্যায়। এ ছাড়া বিটা থ্যালাসেমিয়া, ই-বিটা থ্যালাসেমিয়ার ক্ষেত্রে আরবিসি খুব বেশি ভেঙে যায়, অ্যানিমিয়া হয়। এ পরিস্থিতিতে দেহের চাহিদা পূরণ না হলে শরীর কম বাড়ে। একটা বাচ্চার বয়স ১৬ বছর, কিন্তু তাকে দেখলে মনে তার বয়স ১০ বছর। আর তার শরীরে হেমোগ্লোবিন কম আছে, এ জন্য তার এক্সট্রা মেডুলারি হেমোপ্টাইসিস হতে থাকে, ম্যারো এক্সপানশন করতে থাকে। এটি মানুষের ফেইস দেখে বোঝা যায় এবং দাঁত থাকে আকাবাঁকা। মূল ৩ লক্ষণ হলো, অ্যানিমিয়া, জন্ডিস ও অর্গানোমেগলি থাকবে। সাথে সাথে তার ফেসিয়াল ডিসমফিজম হতে পারে এবং এরপর ডায়াবেটিজ ও থাইরয়েট সমস্যা হতে পারে। 

থ্যালাসেমিয়া চিহ্নিতকরণের উপায়

থ্যালাসেমিয়া চিহ্নিত করতে রক্ত পরীক্ষা আছে। যার নাম কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট। এই রক্ত পরীক্ষা খুবই জরুরি। এ ছাড়া থ্যালাসেমিয়া নিশ্চিত হওয়ার জন্য একটা পরীক্ষাই যথেষ্ট। সেটা হলো, ‘হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফোরেসিস’।   

প্রতিরোধে করণীয় 

যেকোনো বিষয়ই সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হলে সকল পক্ষকে এগিয়ে আমতে হবে। কেউ এককভাবে দায়বদ্ধ না। সামাজিক সংগঠন, ব্যক্তি ও সরকার সহ সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে সচেতনতায় সকলকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে। 

বিয়ের পূর্বে থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা করবে, কিন্তু বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় এটা করা সম্ভব না। যতদিন পর্যন্ত না আইন করা হবে। ততদিন পর্যন্ত বিয়ের পূর্বে থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা করাও যাবে না। এখানে সচেতনতা হিসেবে এই বার্তাই দিতে হবে যে, একজন বাহক (কেরিয়ার) যেন আরেকজন বাহককে (কেরিয়ার) বিয়ে না করে। এতে তাদের অনাগত সন্তানের আশঙ্কা আছে এ রকম জটিল থ্যালাসেমিয়া রোগ হওয়ার। যেহেতু থ্যালাসেমিয়া জন্মগত ও রক্ত সম্পর্কিত রোগ, তাই যাতে পরিবারের মধ্যে বা আত্মীয়-স্বজন বিয়ে না করা হয়। এতে থ্যালাসেমিয়া অনেকটা প্রতিরোধ করা যাবে।

থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসা

আমাদের চিকিৎসা থেকে প্রতিরোধের দিকে বেশি নজর দিতে হবে। শুধু থ্যালাসেমিয়াই না, জন্মগত আরও যেসব রোগ আছে তার চিকিৎসা শুধু বাংলাদেশেই না সারাবিশ্বেই অপ্রতুল। এসব রোগের সহায়ক চিকিৎসাই বেশি। যেমন, রোগীর শরীরে রক্ত থাকছে না, তার শরীরে রক্ত দেওয়া। আর এর চূড়ান্ত চিকিৎসা হলো বোন ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্টেশান (বিএমটি)। কিন্তু এই চিকিৎসা অনেক ব্যয়বহুল। এতো ব্যয়বহুল চিকিৎসা নেওয়া সবার পক্ষে সম্ভব না। 

আর যদি দুই থ্যালাসেমিয়া বহনকারী নারী-পুরুষ বিয়ে হয়ে যায়। তাহলে তাদের সন্তান গর্ভে আসার ১৬ সপ্তাহের মধ্যে কোরিওনিক ব্লাড স্যাম্পলিং বা এমনিওটিক ফ্লুইডে সিনথিসিস পরীক্ষা করে বাচ্চার অবস্থা জানা সম্ভব। 

বিয়ের আগেই রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে প্রত্যেককে জানতে হবে তাঁরা থ্যালাসেমিয়ার বাহক কি না। দুজন থ্যালাসেমিয়া বাহকের মধ্যে বিয়ে বন্ধ করা গেলেই থ্যালাসেমিয়া রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। 

রক্ত দানের উপকারিতা

রক্তদান করা শরীরের জন্য উপকার। ১৮ থেকে ৫৯ বছর পর্যন্ত রক্তদান করা যায়। রক্তদানে বিভিন্ন সাামজিক সংগঠন, চিকিৎসকরা উৎসাহিত করতে পারে। রক্ত তিন থেকে চার মাস এর বেশি বেঁচে থাকে না। এর মধ্যে রক্ত না দিলেও রক্ত নষ্ট হয়ে যাবে। সুতরাং মানুষকে এই বার্তাই দিতে হবে যে, আপনারা চার মাস পর পর রক্ত দিন। এতে ডোনার তৈরি হবে। এ ধারা গতিশীল হলে থ্যালাসেমিয়া রোগীসহ অন্যান্য রোগীরা উপকৃত হবেন।

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত